Posts

পরিবারের সবাইকে নিয়ে পড়ার মত একটি গল্প

-মা! মা! আমি ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট হয়েছি! আমাদের আর কোন দুঃখ থাকবে না। -খোকা! বুকে আয়। তোর বাবা বেঁচে থাকলে আজ কত খুশি হত! পরীক্ষার রেজাল্ট দেবার পর উচ্ছসিত শাহীন ঠিক করেছিলো বেশ নাটকীয় একটা উদযাপন করে তার মাকে চমকে দেবে। কীভাবে কী করা যায়, ভেবে থৈ পাচ্ছিলো না। মাথায় মুকুট পরে হাতির পিঠে করে যাবে? ধুর! তা সম্ভব না কি! হাতি কোথায় পাবে? আর মুকুট কেনারও পয়সা নেই। ওসব মূলতবী থাকুক। ছাত্রজীবনের সর্বশেষ পরীক্ষায় যখন ফার্স্ট হতে পেরেছে, তাতে মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায় যে তার জীবনে সামনে পড়ে আছে শুধুই সুখ আর সমৃদ্ধি। উন্নতির সিঁড়িতে চড়ে সে উঠতে থাকবে পাহাড় চূড়োয়। একটুও হাঁফ ধরবে না। বুক ধরাস ধরাস করবে না। অফুরন্ত তার প্রানশক্তি। এই মূহূর্ত থেকে তার জীবনের সমস্ত অপ্রাপ্তি এবং বেদনাকে তুচ্ছ মনে হচ্ছে। মনেই হচ্ছে না সে একাধিক প্রেম বিপর্যয়, দু-দু বার টাইফয়েড এবং জন্ডিস, এবং বালক বয়সে বাবাকে হারানোর মত দুঃখজনক জীবন পর্যায় অতিক্রম করেছে। ইচ্ছে করছে নিজের কলার ধরে খুব করে ঝাঁকিয়ে দিতে। এখন থেকে সে আর প্রেম প্রত্যাখ্যাত, পেট রোগা, অসুখে ভোগা পিতৃহারা বোকাটে ছেলেটি নয়। সে জীবনযুদ্ধে জয়ী হবার জন্...

একজন ম্যাজিসিয়ান

* লোকটা ভেবেছিলো, চাইলেই সে তার সন্তানদের খুশি করতে পারে। এমন অদ্ভুত ভাবনা কী করে তার মাথায় এলো বলা কঠিন। স্বল্প রোজগারের চাকুরি আর হাড়ভাঙা খাটুনি, সাথে বিনা বেতনের ওভার টাইম, এমন অবস্থায় একজন লোক কী করে এমন ভাবতে পারে? তবে তারপরেও সে ঘরে ফিরে বাচ্চাদের সময় দিতো। ঘোড়া হতো, গরু হতো, মাছ হতো, পাখি হতো, ভূত হতো! এভাবে চলছিলো বেশ। বিপত্তি বাধলো একদিন শখ করে দোকান থেকে এক পাতা সিভিট কেনার পর থেকে। চকলেট, বার্গার অথবা মাংস খাবার সুযোগ সুযোগ তো তেমন হয় না তার সন্তানদের। তাই সেই গোলাকৃতির শুষ্ক ট্যাবলেটেই অমৃত খুঁজে পেলো অপুষ্ট শরীরের শিশুদ্বয়। লোকটা ভাবতেও পারে নি ক্ষণিকের আবেগে নেয়া সেই অপচয়কারী সিদ্ধান্তটি তার এতটা আর্থিক ক্ষতি করবে। প্রতি দিন দুজনকে একটি করে সিভিট না দিলে তারা শুরু করে কান্নাকাটি,ঝগড়াঝাটি, অশান্তি। কী করা যায়, কী করা যায়? লোকটা ভাবলো। অনেক ভাবলো। একসময় সে চমৎকার একটা সিদ্ধান্ত নিলো। সে জাদু দেখাবে তার সন্তানদের। * -বাবা’রা, চোখ বন্ধ করো তো! তোমাদের এখন কী দিবো বলো তো? -কী বাবা? -সিভিট! -ইয়েয়ে! লোকটা মানিব্যাগ থেকে একটি সিভিট বের করলো। মোড়ক থেকে খুলে নিয়ে ভেঙে দু...

অনেক বিল উঠে গেছে

প্রচণ্ড ক্ষিধের সময় যদি হাতের কাছেই একটি ভালো রেস্তোরা পাওয়া যায়, এবং সেখানে যদি ভালো মানের মোগলাই পরোটা আর শিক কাবাব থাকে তাহলে ক্ষুধাতুর ফ্যাকাসে সন্ধ্যাটা আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আমি খেতে ভালোবাসি। ক্ষুধা একটি বিপদজনক বস্তু। বিশেষ করে এই ঢাকা শহরের বিশাল জ্যাম আর বাসে ওঠার প্রতিযোগিতায় নিজের মুল্যবান সময় বিলিয়ে দেয়ার অফিস পরবর্তী সময়গুলোতে। যে বিকেলগুলোতে আমি ভাবি যে নাস্তা না করে কিছু টাকা বাঁচানো যাক, ঠিক সেদিনই দেখা যাবে জ্যামের কারণে বাসায় পৌঁছুতে রাতের খাবার সময় পার হয়ে যায় আর কী! এরকম কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হবার পর থেকে আমি পকেটে কিছু বাড়তি পয়সা রাখি, এবং বিকেলবেলায় অল্প কিছু হলেও খাই আসন্ন মহাযাত্রায় টিকে থাকার রসদ যোগাতে! আজ অফিস থেকে বের হবার পরপরই ক্ষুধা চাগাড় দিতে আরম্ভ করলো। দুপুরে কাজের চাপে কোনমতে পাঁচ মিনিট সময় বের করে দুটো সিঙ্গারা আর এক কাপ চা খেয়েছি। এতক্ষণে সেগুলো হজম হয়ে ড্রেইনেজ সিস্টেমের অংশ হয়ে মাছেদের ক্ষুন্নিবৃত্তি করেছে। তো যা বলছিলাম, এই রাক্ষুসে ক্ষিধে নিয়ে আমি যখন ভালো একটি রেস্তোরা খুঁজে ফিরছি, তখনই মুরগী ভাজা, কাবাব, আর বিরানির গন্ধে আমার মনটা উড়...

পাখিরাজ্য

তুষি কাঁদছে। তুষি, আমার একমাত্র সন্তান। ও কাঁদলে আমার বড় খারাপ লাগে। আমার এই ছন্নছাড়া জীবন তুষিবিহীন, অবিশ্বাস্য! আমার ভালোবাসা, ভাবনা, আশঙ্কা, ভয়, পরিকল্পনা সব তুষিকে ঘিরেই আবর্তিত। । এখন ওর বয়স তিন। গত তিন বছরে আমাকে কম সংগ্রাম করতে হয় নি জীবনের সাথে। ওকে জন্ম দিতে গিয়ে ওর মা মারা গেলো। ওকে ডে-কেয়ার সেন্টারে রেখে অফিসে যেতে হত । সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা হত, ওর ঠিকমত যত্ন হচ্ছে তো? ও কাঁদছে না তো? ওর কি বাবার কথা মনে পড়ছে? যান্ত্রিক গর্দভের মত কঠোর পরিশ্রম করে টাকা জমাতাম । সবরকম বিলাসব্যাসন, সৌখিনতা বাদ দিয়েছিলাম। রিকশায় চড়া ভুলে গিয়েছিলাম। হাঁটতাম, প্রচুর হাঁটতাম। ধূমপান করা বাদ দিয়েছিলাম। তুশি, এই ছোট্ট বয়সেই কী মায়ায় ভরা ওর বুক! আমার জ্বর হয়েছিলো একবার। ওর তখন আড়াই বছর বয়স। শুয়ে শুয়ে কাতরাচ্ছিলাম । আর ও আমার কাছে বসে আমাকে আদর করে, চুমু দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলছিলো "আল্লাহ জ্বর ভালো করে দিবে বাবা"। ওর সাথে একটা খেলা খেলতাম আমি, ডাক্তার-ডাক্তার খেলা। সারাদিন দস্যিপনা করে কোথাও না কোথাও ব্যথা পেতোই সে। আর আমি ঘরে ফিরে ওর সেসব জায়গায় মিছেমিছি এ্যানেস্থিসিয়া, ইনজেকশন আর ঔষধ দিয়...

ফ্লাজলামি

আমার একজন প্রেমিকা আছে। তার অধরে টিয়া পাখির ঠোঁটের মত লাল টুকটুকে আনন্দের সমাহার। তার চোখের অতলে বরিশালের সুপুষ্ট নদীগুলোর মত গভীর জলপ্রাসাদ। তাকে আমি একটা নাকফুল কিনে দিয়েছি। গ্রিক দেবীদের মত খাড়া নাকটি আঁকড়ে ধরে রাখা নাকফুকটিকে আমার হিংসে হয় মাঝে মধ্যে। অতটা কাছে কেন আমি যেতে পারি না? নাম তার শায়লা। আমার “হতে যাচ্ছে”অর্ধাঙ্গিনী। বিয়ে নামক সামাজিক সনদটা পাবার আগে প্রি রিকুয়েস্টেড কোর্স হিসেবে আমরা প্রেমের ইশকুলের মনোযোগী শিক্ষার্থীদের মত ক্লাশ করে যাচ্ছি। আপাতত আমরা লাস্ট সেমিস্টারের মাঝামাঝি পর্যায়ে আছি। এই পরিস্থিতিতে আমরা শিখছি ‘শেয়ারিং’। আমরা দুজনেই এক অন্যকে সব বলি। মন খারাপ হলে, মন ভালো হলে, দুঃখের সিনেমা দেখে মন কাঁদলে, হাসির বই পড়ে আমোদ পেলে, কলিগের কূটনামীতে বিরক্ত হলে, বাসের কন্ডাক্টরের সাথে ঝগড়া হলে, সব বলি। তার সাথে দেখা করতে এলে লম্বা ডাঁটা অলা শ্বেত শুভ্র রজনীগন্ধা , অথবা শিউলি ফুলের মালা উপহার দেই। আরো দেই চকলেট, আইসক্রিম, টিপ অথবা দুল। শহর থেকে দূরে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক পরিবেশে চমৎকার সময় কাটাই আমরা। ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর হই, হালকা খুনসুটি করি, ছদ্মরাগের কপটতায় দূর...

ক্রেইজি বিচ

(১) উৎকণ্ঠিত মুখে ফোনের বাটন গুলো চাপছে জয়া। আসিফের সাথে তার কথা বলা দরকার। ফোন ধরছে না কেন? সর্বনাশ হয়ে যাবে তো! -এতক্ষণে ফোন ধরলে? তোমার সাথে খুব জরুরী কথা আছে। খুব জরুরী। -কী এমন জরুরী কথা যে সাত সকালে ঘুম থেকে ওঠালে? হাই তুলছে সে। কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি। -সাত সকাল নয়। এখন এগারটা বাজে। -ছুটির দিনে ওটাই সাত সকাল। -আচ্ছা! শোনো তুমি আজ ঘর থেকে বেরুবে না। একদম না। -কেন? কী হয়েছে? -কিছু হয় নি, কিন্তু কিছু হতে পারে। ইয়োর লাইফ ইজ এ্যাট স্টেক। -তাই নাকি? আমি যে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলাম তা সবাই জেনে গেছে? -ফালতু কথা বলবা না। সিরিয়াসলি নাও ব্যাপারটা। তোমার সাথে সক্কাল সক্কাল ফাজলামি করার জন্যে ফোন করি নি আমি। আমার অত তেল নাই এখন আর। -হ্যাঁ, একসময় খুব তৈলাক্ত বস্তু ছিলে বটে। এজন্যেই তো তোমাকে ধরতে গেলে বারবার পিছলে যেতে। -কেন কী করেছি, কে দোষী আর কে নির্দোষ এসব মীমাংসা পরে হবে। আমি জানি তোমার প্রতি এত অধিকার ফলানো আমার আর শোভা পায় না। তবুও, কারো আসন্ন বিপদ সম্পর্কে জেনেও তাকে সাবধান করবো না এমন অমানুষ তো আমি নই। জয়া কি অভিমান করছে? তার কণ্ঠে এমন বিপন্ন ক্লান্তি কেন? ব্যাপার কি ...

শূন্যমাত্রিক

বাসের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম যাত্রী ছাউনিতে বসে। প্রায় আধঘন্টা হতে চললো, বাসের দেখা নেই। আমার পাশে বসে ছিলেন দুইজন ভদ্রমহিলা, একজন ভদ্রলোক, তার সন্তান এবং কলেজ পড়ুয়া দুটি ছেলে। বসে থাকতে থাকতে তারা বিরক্ত হয়ে উঠে গেছে। আপাতত আমি একা। এই যে বাসের অপেক্ষায় এভাবে যাত্রী ছাউনিতে বসে থাকা, এটাকে এক ধরণের বিলাসিতা বলা যেতে পারে। ঢাকা শহরে বাসে উঠতে হলে প্রয়োজন পেশীশক্তি, দৌড়ের দক্ষতা, এবং সূক্ষ্ণ ইনটুইশন ক্ষমতা। দূর থেকে বাসের আগমন দেখে আগেভাগেই প্রস্তুত হয়ে সবাইকে পিছে ফেলে দৌড়িয়ে কোনমতে বাসের পাদানিতে পা রাখতে পারলে তবেই তাকে দক্ষ নাগরিক বলা যেতে পারে। আমিও এভাবেই বাসে উঠি। কিন্তু আজ আমার অত তাড়া নেই। সকাল সকাল অফিস থেকে বের হয়েছি। যাত্রী ছাউনিতে বসে বাদাম খেতে খেতে মানুষ দেখতে ভালো লাগছে। অবশ্য এখানে প্রায় সবাই একই রকম দেখতে। বাসে ওঠার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, ঘামে জর্জর মানুষগুলো বাসায় ফিরলেই তবে তাদের প্রকৃত রূপ ফিরে পাবে। ঘরে ফেরাটা কী সুন্দর, কোমল; আর রাস্তায় তারা বদমেজাজী, ঝগড়াটে, খিস্তিবাজ ! তবে এদের মধ্যে একজনকে দেখে বেশ আলাদা লাগলো। তাকে লক্ষ্য করছি মিনিট পাঁচেক ধরে। জলপাই রঙের গ্যাবা...