একজন কুসঙস্কারাচ্ছন্ন মানুষ

*
আমার স্ত্রী একজন কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ। তাকে আমি যতই বোঝাইনা কেন, সে তার নিজস্ব ধ্যানধারণা নিয়েই পড়ে থাকবে। কুসংস্কার বলতে আবার বাইরে বেরুনোর সময় পিছ থেকে ডাকলে অমঙ্গল হয় বা পরীক্ষার আগে ডিম খাওয়া যাবেনা এরকম না, কুসঙস্কারের আধুনিকায়ন করেছে সে। আধুনিকায়ন না বলে অদ্ভুতায়ন বলাটাই শ্রেয় হবে। এমনিতেই কুসঙস্কার ব্যাপারটাই অদ্ভুত, তারগুলো আরো বেশি। রাতের বেলা বিছানায়... না থাক, এসব একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। জনসমক্ষে বলার মত যেগুলো, সেগুলোর জন্যে আমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছি তা না, সে আমার ওপর কোন কিছু চাপিয়ে দেয়না, আনমনে কথা বলে, বিচিত্র সব ছবি এঁকে রাখে দেয়ালে বাচ্চাদের মত। বাচ্চাদের প্রসঙ্গ আসলোই যখন, তখন বলেই ফেলি, আমাদের কোন বাচ্চা কাচ্চা হবেনা। এটা নিয়ে ওর আক্ষেপ থাকলেও আকাঙ্খা পূরণের জন্যে কখনও কোন কুসঙস্কারের দ্বারস্থ হয়নি। পীর-ফকির-তাবিজ-কবিরাজ এমনকি হোমিওপ্যাথিতেও তার বিশ্বাস নেই। কোন পীর-ফকির এই লেখাটা পড়লে নিশ্চয়ই আগের লাইনটার আগ পর্যন্ত খুব খোশমেজাজে ছিলো! কারণ তারাই তো কুসঙস্কারের ডিপো। দুঃখিত জনাবেরা, ওর কুসঙস্কারগুলো অন্যরকম। আমি যখন লিখতে বসি, তখন সে সামনে থাকলে সবসময় একটা আপেল সাধবেই আমাকে। আপেল সবসময় থাকে ফ্রিজে। ও কখনও পীড়াপীড়ি করবেনা, হাতে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে বলবে।
"খাও,অন্তত একটা কামড়"
কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলে একদিন আমি এমনিতেই জেনে যাবো। আমার অবশ্য জানার তেমন কোন আগ্রহ নেই। ছোট্ট একটা কামড় দিয়ে লিখতে বসি, আজ বেশ ক্ষুধা ছিলো বলে পুরোটাই খেয়েছি। তারপর লিখতে বসা...
*
আমাকে সে বলে কুসঙস্কারাচ্ছন্ন! এতদিন ছন্নছাড়া জীবন কাটিয়ে আমাকে পেয়ে যে খুব গুছিয়ে নিয়েছে, তা না, বরঙ আমার নিরলস নিস্পৃহতায় আরো হতচ্ছাড়া হচ্ছে দিনকে দিন। আচ্ছা বলুকগে , হয়তোবা আমি তাই। কিন্তু সে যে অভিশপ্ত একজন মানুষ তা কি জানে? আমি অবশ্য তার অভিশাপ কাটানোর জন্যে আমার কুসংস্কারাচ্ছন্ন আচরণসমূহ করিনা। প্রথম যেদিন আমরা মিলিত হলাম...নাহ থাক এসব একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। বলা ঠিক হবেনা। একটু আগে সে লিখতে বসল, তাকে একটা আপেল দিলাম। সবসময়ই দিই। সে লেখালেখি করে। লেখালেখি করাটা, তাও আবার বিকল্প ধারার সাহিত্য, আমার কাছে পাপ মনে হয়। কেন মনে হয়? কারণ যারা এই পথ বেছে নেয় তাদের ওপর অভিশাপ পড়ে। যেচে পড়ে নিজেকে অভিশপ্ত করাটা তো পাপ'ই। তাই সে যখন লিখতে বসে তাকে আদিপাপের উপকরণটা খাইয়ে দিই। শয়তান খাইয়েছিলো বিবি হাওয়া বা ইভ যাহোক কোন একজনকে। এখন আমি সে শয়তানিটা করছি তার সাথে হাহা! মর্ত্যেই থাকুক, স্বর্গ লেখকদের জন্যে না। আমার কথাগুলো খুব অযৌক্তিক শোনাচ্ছে নিশ্চিত, তা শোনাক, কিছু কুসংস্কার মেনে চলছি, চলুক। আমাদের কোন সন্তান হবেনা। হবে কীভাবে? সে আমার জরায়ু টেনে বের করে ছিড়ে পোকামাকড়কে দিয়ে খাইয়েছেনা? সে বলতে কিন্তু আমি তার কথা বলছিনা। এটা অন্য একজন। তার সাথে বোঝাপড়া হবে পরে।
*
-কী বলছ বিড়বিড় করে?
-বোঝাপড়া করছি একজনের সাথে।
-সেই একজনটা কে?
-তুমি কোনদিনও জানবেনা।
-বুঝেছি। এটা তোমার সেই জরায়ু সঙক্রান্ত বোঝাপড়া না?
-হ্যাঁ, বেশ বুঝেছো।
-কিন্তু এটা বুঝিনা তার সাথে কথা বলার সময় পাজরের ওপর হাত রাখতে হয় কেন? কী সব কুসঙস্কার!
পাজরের ওপর- প্রকৃতপক্ষে পাজরের হাড়ের ওপর কেন হাত রাখি সেটা ওকে বলার প্রয়োজন মনে করিনা। আদম না এ্যাডাম কার যেন পাজরের হাড় থেকে নাকি হাওয়া বা ঈভের সৃষ্টি। আমার ওপর যে অনাসৃষ্টি হয়েছে তার সাথে সাম্যাবস্থা তৈরীর জন্যে ওখানে হাত রাখি। নিজেকে আদিমাতা হিসেবে ভেবে উল্টোপথে সৃষ্টি এবং স্খলনের প্রক্রিয়া তৈরী করি।
-তোমার কী খুব কষ্ট হয়?
-আমি অনেক ভালো আছি। তোমার মত প্রসববেদনা হয়না ঘনঘন!
-হাহা!
-যাই, আমার বাগানে যাবার সময় হল।
সাধারণ চোখে দেখলে অন্য আর দশটা বাগানের মতই মনে হবে, গাঁদা ফুল, ক্যাকটাস, আমগাছের চারা...বাগানটির নাম দিয়েছি "গার্ডেন অফ ইডেন"। ঐ যে, আদম দাদামশাই যেখানে বসে অলস সময় কাটাতেন। এই বাগানে সবচেয়ে ফলবতী গাছ হল বড়ই গাছটা। এই গাছের নাম দিয়েছি "দ্যা ট্রি অফ নলেজ"। নিষিদ্ধ ফল গন্ধমের গাছ। এখানে অবশ্য গন্ধমের নামগন্ধ নেই, খেতেও বারণ নেই কারো। বরঙ এটা থেকেই সবচে বেশি খাওয়া হয়। সবাই খেতে পারবে, শুধু একজন বাদে। যে আমার জরায়ুতে কর্কট বসিয়েছিলো। আসুক না একবার সাহস করে, খেয়ে দেখুক না ফল! আমার সে অবশ্য এতসব জানেনা, সে শুধু জানে যে আমার সাধের বাগানের ফুল ছিড়লে আমি রাগ করি, দুষ্টু ছেলেরা ফল পেড়ে খেলে রাগ করি, কিন্তু এই গাছ থেকে যে যত ইচ্ছা ফল খাক, কোন বারণ নেই। এটাকেও সে কুসংস্কার ভেবে বসে আছে কিনা কে জানে!
*
-তুমি নিস্পৃহ।
-তুমিও।
-আমরা দুজনেই। ভালো হয়েছে ম্যাচিংটা! তাইনা?
-নিস্পৃহদের আবার ভালো মন্দ কী!
-তা বটে।
-তুমি অভিশপ্ত।
-সপ্তসমুদ্র পাড়ি দিতে রাজি আছি এরকম অভিশাপ অর্জন করতে!
-তুমি পাপী।
-কেন?
-এতশত লেখ, কত চরিত্র বানাও, কত অনুভূতির পসরা সাজাও অক্ষর বিন্যাসে, কিন্তু তুমি নিজে অনুভূতিহীন। তাহলে অনুভূতিগুলো তুমি পাচ্ছো কোথা থেকে? নিশ্চয়ই কোন অসৎ পথ থেকে এসেছে। ইউ আর নট অনেস্ট মিস্টার!
-আমি এই সঙলাপগুলো কোন একটা গল্পতে দিয়ে দেবো। ভালো বলেছো বেশ!
-তুমি কী নিজেকে ঈশ্বর ভাবো?
-সর্ট অফ। সৃষ্টিশীল প্রতিটা মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরস্বত্তা আছে।
-আমি তো সৃষ্টিশীল না। আমার থেকে কিছু জন্ম নেবেনা।
-তোমার কুসংস্কারগুলো কিন্তু বেশ ক্রিয়েটিভ!
-আমার কথা কি শুনছো? আমি বলেছি আমার থেকে কিছু জন্ম নেবেনা!
-ওহ! হু, বুঝলাম। স্যরি।
-আমার ওগুলো কুসংস্কার না। আমি একটা প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি বলতে পারো। বিশাল প্রজেক্ট।
-কিরকম সেটা?
-এর নাম দিয়েছি "উল্টেশ্বরী প্রকল্প"। অনেক রাত হয়েছে। এখন ঘুমাও।
ঈশ্বর! সে নিজেকে ঈশ্বর ভাবে, সর্ট অফ। যাই হোক, কিছুটা ঈশ্বর হলেও চলবে। আমার বাগানে ঈশ্বর আছে কালো তালিকায়। ফলবতী বড়ই গাছের ফল খাওয়া বারণ তার। আমি চাচ্ছিলাম খুব ও ব্যাটা একদিন আসুক আমার বাগানে, বারণ করা স্বত্ত্বেও ফল খাক, তারপর আমি তাকে ধমক দিয়ে স্বর্গে পাঠিয়ে দেবো।
*
-শোন, তুমি আমার বাগানের সব ফল খেতে পারবে কিন্তু বড়ই গাছের কাছেও যাবেনা।
-এ আবার নতুন কোন খেয়াল! আমি বড়ই পছন্দ করি।
-আমি কোন কথা দুইবার বলিনা।
-আমাদের মধ্যে এমন সম্পর্ক নেই যে, মান-অভিমান-ঝগড়াঝাটি হবে এসব ব্যাপার নিয়ে। শীতল।
-শীতল।
-আমি বাগান থেকে ঘুরে আসি। তোমার বারণ মানবো কিনা নিশ্চয়তা দিতে পারছিনা।
-অভিশপ্ত মানুষের আর কী'ই বা হারাবার থাকে!
-সেটাই।
তাহলে শুরু করা যাক প্রকল্পের কাজ! ওহ, একটা ভুল হয়ে গেছে। শয়তানকেও তো লাগবে। পাই কোথায়? অসুবিধে নেই, অপেক্ষা করতে করতে পেয়ে যাবো। শয়তান পাওয়া খুব কঠিন কিছু না।
-দাঁড়াও আমিও আসছি!
আমরা পাশাপাশি হাঁটছি। ফুলবাগানে দম্পতির বৈকালিক পরিভ্রমণ খুব রোমান্টিক দেখানোর কথা বাইরে থেকে, আদতে ব্যাপারটা তা নয়। আমাদের সম্পর্কের রঙ এই গোধূলিবেলার মতই আবছা।
-আচ্ছা তুমি আরেকটা বিয়ে করনা কেন? সন্তান পাবে।
-আলস্য!
-যাক, তাও বলনি যে তোমার মহানুভবতা ইত্যাদি!
-ওসব বইয়ে লিখি। বাস্তবে আমি কেমন তুমি জানো।
-নিস্পৃহ।
-তোমার মত।
-তুমি অভিশপ্ত! তুমি পাপী! তুমি শয়তান!
-হ্যাঁ অভিশাপ এবং পাপের ব্যাপারে সেদিন যা বলেছিলে পছন্দ হয়েছে।
-তুমি ঈশ্বর হতে পারো, শয়তান হতে পারোনা?
-মানে?
-সেদিন যে বললে তুমি সৃষ্টিশীল মানুষ, তাই তোমার মধ্যে ঈশ্বরের স্বত্ত্বা আছে। শয়তানের স্বত্ত্বা নেই?
-সেতো সব মানুষের ভেতরেই থাকে।
-তোমার সবচেয়ে খারাপ কাজ বা চিন্তা কী?
-বলা যাবেনা।
-গুড! তাহলে বেশ ভালো শয়তান তুমি। আমার প্রজেক্ট শেষের পথে।
-কীসের প্রজেক্ট-ফ্রজেক্ট বলছো কদিন ধরে, বিরক্তিকর!
বিরক্তি তার মধ্যে গতি সঞ্চারিত করে। আমাকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে বড়ই গাছটার কাছে যায়। বারণ মানলোনা। শয়তানের পাল্লায় পড়েছে। এখন তুমি ঈশ্বর হও। ঈশ্বর, তোমাকে নশ্বর বানাবো আজ!
-এই, তোমার লেখা কবিতা থেকে একটু শোনাওনা কয়েকটা লাইন!
আমি তার কাছে যাই। সে কিছুটা অবাক হলেও খুশীর ভাবটা লুকোতে পারেনা। ঈশ্বরেরা বরাবরই স্ততিপ্রিয়। হ্যাঁ, বলছে, বলছে সে কবিতা! তার সৃষ্টি। সে একজন ঈশ্বর এখন। বাগে পেয়েছি ঈশ্বরটাকে! আমার আপেল ফল, গার্ডেন অফ ইডেন, ট্রি অফ নলেজ, পাজরের হাড়, সবকিছু এবার সিনক্রোনাইজড হয়েছে, উল্টেশ্বরী প্রকল্প সাফল্যের মুখ দেখার পথে!
-কেমন লাগলো কবিতাটা?
সদা শীতল মুখে এখন তেলতেলে হাসি। জানিতো, ঈশ্বর মানেই প্রশংসালোভী, আর নিজেরা অন্যদের ওপর যাচ্ছেতাই করে বেড়াবে! আমার জরায়ুতে কর্কট রোগ দিয়েছিলো ঈশ্বর। তার সাথে বোঝাপড়া এখনও শেষ হয়নি অবশ্য। তবে তার একজন অনুচরকে তো পেয়েছি! কবিতা সম্পর্কে আমার মতামত জানিয়েছি কী জানাইনি, সে বড়ই ফল মুখে পুরে দিলো। এবার আমার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে!
*
-নিষিদ্ধ ফল খেয়েছো তুমি! মর্ত্যে থাকার আর কোন প্রয়োজন নেই তোমার। স্বর্গে গিয়ে আরাম কেদারায় বসে হুরপরীদের নৃত্য দেখো। আয়েশ করে শরাব পান কর! আমার আদেশ ভঙ্গ করার ফলে তোমাকে আমি স্বর্গে নিক্ষেপ করলাম! এটা তোমার শাস্তি!
হিস্টিরিয়াগ্রস্থের মত হাসছে সে। ব্যাপার কিছুই বুঝতে পারছিনা। মাথায় গন্ডগোল নাকি? কার্ডিগানের পকেট থেকে একটা ছুরি বের করে ধেয়ে আসছে আমার দিকে!
-যদ্দুর জানি পাপ-টাপ তেমন করনি, সুতরাঙ, স্বর্গেই যাবে। মৃত্যু! মৃত্যুর পর সৃষ্টিপ্রক্রিয়া থেমে যায়। হাহাহা! হাহাহা! বাগে পেয়েছি আজকে ঈশ্বরকে।
-শোনো! থামো! কী করছো এসব? আরে...
*
লেখকদের জীবনীশক্তি কম হয়। গলায় ছুরিটা সেধিয়ে দিতেই গলগল করে রক্ত পড়লো কিছুক্ষণ। তারপর দুম করে পড়ে গেলো! আমার "উল্টেশ্বরী প্রকল্প" সফল হলো। আমি কিছু সৃষ্টি করতে পারিনা। আমি কাউকে জন্ম দিতে পারবোনা। তাই কথিত ঈশ্বর এবং সৃষ্টি সংক্রান্ত কাহিনীটাকে উল্টো করে সাজিয়ে ঈশ্বরের সাথে বোঝাপড়া শেষ করলাম, যেহেতু ঈশ্বরই আমার জরায়ুতে কাঁকড়া-বিছে ছেড়ে দিয়েছিলো। এটা অবশ্য প্রাথমিক পর্ব। সামনে আরো কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ভাবার অনেক অবসর।

Comments

Popular posts from this blog

প্যাথেটিক হোমিওপ্যাথি, কেন বিশ্বাস রাখছেন!

তোমার জন্যে শুভ্র গোলাপ, বেড়ালতমা -হামিম কামাল

How to Integrate External API in a WordPress Page: 5 Ways To Do It