বেচারা এবং অনুভূতিখোর সংক্রান্ত জটিলতা

*
এই পৃথিবীতে কখনও কোন দিন ছিলোনা। মানুষ যাকে সূর্যালোক বলে সেটা বিভ্রম ছাড়া কিছু না। রাত। রাত এবং চাঁদ। জোছনা- যাকে মাথামোটা বিজ্ঞানীরা দাবী করেছে চাঁদের ওপর প্রতিফলিত আলো...এসব মতবাদ এখন আর চলছেনা। ঐ যে দেখতে পাচ্ছেন ছেলেটাকে, তার কাছে পুরোটা সময়ই রাত। দিনের কোন অস্তিত্ব নেই কোথাও। রাতখোর হয়ে পড়ে আছে।
-স্যররি? আমি পড়ে আছি? দেখতে পাচ্ছেন্না আমি উর্ছি। উড়ে উড়ে দূরে দূরে...
হু! বললেই হল আর কি! অবশ্য নিরামিষভোজী মানুষের কথায় কান দিয়ে হবেইটা বা কি! ছেলেটা ভাবে। নিরামিষ, আমিষ ইত্যাদি সুখাদ্যের সাথে জোছনা এবং রাত পান করাটাও জরুরী, এটা তারা বুঝতে পারেনা। ফাঁকা রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছে ছেলেটা। তার পকেটভর্তি টাকা। আশপাশ থেকে পছন্দের কোন কিছু পেলেই কিনে ফেলছে। এই যেমন কিছুক্ষণ আগে বেলুন কিনলো, যা ফুলিয়ে প্যারাসুটের আকৃতি দিয়ে ভেসে বেড়ালো কিছুক্ষণ মেঘেদের দেশে। কয়েকটা তারা ছুঁলো। মেঘ এর হাওয়াই মিঠাই বানিয়ে খেলো। ছেলেটার মস্তিস্ক অনুরণিত হচ্ছে প্রবলভাবে। অনুরণনের রণবাদ্যে তাল মিলিয়ে নেচে চলেছে পরীদের সাথে। রঙধনুতে কিছু আঁকিবুকিও করল।
সে রাতখোর।
সে অনুভূতিখোর।
সে ভেসে বেড়াতে ভালোবাসে। অনেক উঁচুতে উঠতে চায়। সবাই এরকম পারেনা। আসলে, চায়না। ঝামেলা তো কম না!
হাঁটতে হাঁটতে ছেলেটার কিছু প্রিয়মুখ মনে পড়ে। যার সাথে অথবা যাদের সাথে এই রাস্তায়ই একদিন হেঁটে যেতো, কথা বলতো, খুনসুটি, খোঁচা, আনন্দ! তারা সব কোথায় হারিয়ে গেছে? ছেলেটির উত্তপ্ত অনুরণিত মস্তিস্ক জানান দিলো, "তারার দেশে, ওখানে গেলে পাবে"।
সুতরাং সে আবার ওড়ার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু এবার কোন একটা গন্ডগোল বেঁধে যায়। সে উড়তে উড়তে যখন মধ্যআকাশে পৌঁছে গিয়েছিলো তখন হঠাৎ বেলুনটি ফেঁটে চুপসে যায়। সে নামতে থাকে দ্রুত...
*
রাত আমার ভালো লাগে ভীষণ। মনে হয়, সারাক্ষণ যদি রাত হত! এই নির্জনতা, ঝিঁঝিঁপোকাদের অর্কেস্ট্রা, তারাদের আতশবাজী-সবসময়ই যদি থাকতো! মাঝে মাঝে ভালো লাগেনা কিচ্ছু। মনে হয় নিজের মত করে চারিপাশটাকে বদলে দেই। খুব একটা কঠিনও না কাজটা। কায়দাকানুন জানা আছে আমার। অনুভূতিহীন জীবনের শীতল স্পর্শে কখনও শিউরে উঠলে চলে যাই অন্যজগতে। আজকে যেমন, কিছু ভালো লাগছেনা। চোখটা একটু বুজেছিলাম সঙ্গে সঙ্গে যেন নরকের প্রহরীরা এসে চোখের সামনে কালো পর্দা টানিয়ে দিলো। কি ভীষণ পুরু অন্ধকার! আমি হাঁপিয়ে উঠি। অনুভূতিহীনতা, অন্ধকারের আস্ফালন আমাকে বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই আমি বেড়ুই।
হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তাটার কাছে চলে এসেছি। অনেক ভীড় এসময়ে। ভীড় কেটে এগুতে আমার কষ্ট হয়, অধৈর্য্য হতে থাকি...
*
সেই ছেলেটা নামছে আকাশ থেকে। ওপর থেকে নীচে নামছে। ওপর থেকে নীচে নামতে তার প্রবল অনীহা, সে নিস্ফল ক্রোধে বায়ূতে ঘুষি মারে। কিন্তু সে নামতেই থাকে...
*
"আব্বে হালা ফাইজলামি করচ? রাস্তার মইদ্যে শুয়াচোস ক্যালা?নেশা কর্চচ?"
"আর বলবেননা, যুবসমাজ ক্রমশঃই অবক্ষয়ের দিকে যাচ্ছে..."
"ঐ ব্যাডা উটলি? নাইলে কৈলাম বডির উপর দিয়া গাড়ি চালায়া দিমু"
ছেলেটা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
*
একটা ছেলেকে ঘিরে জটলা দেখা যাচ্ছে। বেচারা রাস্তার মাঝখানে শুয়ে আছে। লোকজন তো মহাক্ষ্যাপা। মেরেই বসে নাকি! মারলে মারুক, আমার ওসব দেখার সময় নেই। উপস! ঐটা চপল ভাই না? তাইতো মনে হচ্ছে। আমি দৌড়ে তার কাছে পৌঁছে যাই। হ্যাঁ, চপল ভাই'ই তো!
"কি হয়েছে চপল ভাই? শরীর খারাপ?"
সে কোনমতে উঠে বসে। আমি তাকে টেনে নিয়ে যাই। সেসময় জনগণের কাছ থেকে কিছু খিস্তি এবং তিরস্কার আমার ভাগ্যেও জোটে। ওসব পাত্তা দেইনা।
*
চপল ভাই এখন একটু ধাতস্থ হয়েছে। আমাদের মধ্যে কুশলাদি বিনিময়ের প্রথা নেই। সম্পর্কের ভিত্তি অন্যখানে।
"আছে তোমার কাছে কিছু? আমি পুরা খালি।"
"না, আমার কাছে কিছু নাই, তবে টেনশন নিয়েননা। ব্যবস্থা করা যাবে। টাকা নিয়ে এসেছি।"
"দে টাকা দে!"
"আপনি হাইজ্যাকার নাকি চপল ভাই!"
"হইতে দেরী নাই। দরকার হৈলে নিজের বাপের গলায় ছুরি ধরুম। আইজকা তুই টাকা না দিলে তোরেও শ্যাষ করুম। অবশ্য ছুরি নাইক্যা..."
এসব হুমকি-ধামকিতে আমি বিচলিত হইনা। এজন্যে না যে, সে অহেতুক হুমকি দেখাচ্ছে। সে যা বলেছে তা করে দেখাবে প্রয়োজনে। আসলে এখানকার বন্ধুত্ব এমনই নিষ্ঠুর। জানি বলেই ধাক্কা খাইনা। কিন্তু খুব খারাপ লাগে চপল ভাইয়ের জন্যে। সে ঐ পর্যায়ে চলে গেছে! আমিও হয়তোবা যাবো কোন একদিন! আপাতত এসব ভাবনাকে বিদেয় করে দিই। আমরা এখন যাবো কৃত্রিম অনুভূতির সন্ধানে, যা মৌলিক বা প্রাকৃতিক অনুভূতিগুলোর চেয়ে হাজারগুণ জমকালো।
ফিলিংস!
*
রাত নেমে এসেছে শহরে। এখন রাস্তায় কেউ নেই। মাঝেমধ্যে দুয়েকটা দেবরথ উড়ে যাচ্ছে। ফ্যাশন হাউজের জড় ম্যানিকুইন মেয়েদের জায়গায় হাস্যোজ্জল পরীরা। স্বর্গীয় অনুভূতি! আমরা অনুভূতির সওদা করি রাতের বেলা। আমাদের শিরায় শিরায়, নিউরনের আনাচে কানাচে অনুভূতিরা বাচ্চা ছেলেদের মত লুকোচুরি খেলতে থাকে। আমার মনে পড়ে যায় শৈশবের কথা। কৈশোরের কথা। আমি সুখকল্পনায় নিমজ্জিত হই। এহেন সুখকল্পনার জন্যে হাঁটাহাঁটি উপযুক্ত প্রক্রিয়া না। চপল ভাইকে বলি একটা দেবরথকে থামাতে।
"হ্যাঁ, শিওর! আমার পকেটভর্তি টাকা। কোন সমস্যা নেই"
আমরা স্বর্গীয় আলোকময় রথে উঠে বসি। বাতাসে আমাদের চুল ওড়ে। আমরাও উড়ি। আমরা উঁচুতে উঠি। আরো ঊঁচুতে।
কঠিন পিনিক!
*
নামার সময় হয়ে এসেছে। চালক আমাদের রুক্ষকন্ঠে জানায়। দেবরথের চালক। তার এতক্ষণকার আচরণ ছিলো সৌহার্দ্যপূর্ণ। তাই আমরা বিষণ্ণ হই তার অকস্মাৎ রুক্ষতায়।
"নামেননা কেলা? ভাড়া হৈছে ২৫ টাকা"
*
রিকশা থেকে নেমে আমরা টলোমলো পায়ে হাঁটতে থাকি। এখন আমরা অনেক নীচুতে, ওপরে ওড়াউড়ির ধকল সামলাতে হচ্ছে এখন। আমরা একে অপরকে অবলম্বন করে হাঁটি। চারিপাশের কোলাহল, আর যান্ত্রিক গর্জন আমাদেরকে বিপন্ন এবং আতঙ্কিত করে। আমরা কোনমতে ফুটপাথে জায়গা করে নিয়ে বসি।
শূন্যতার প্রহর কাটতে থাকে। আমরা ঊঁচুতে থাকা অবস্থাকালীন দৃশ্যাবলী স্মরণ করার চেষ্টা করি। কিন্তু বাধ সাধে পুলিশ।
"ঐ হিরুঞ্চি, এখান থিকা উঠবি নাকি পাছায় দিমু দুইটা বাড়ি?"
*
আমাদের উঠতে সাহায্য করে একজন সাদা ছড়িঅলা এই রাতেও কালো চশমা পড়া একজন ব্যক্তি। অপ্রকৃতস্থ অবস্থায়ও ঠিকই বুঝি যে লোকটি অন্ধ। আহা বেচারা!
চলতে চলতে তার সাথে আমাদের কথা হয়। বেশ কথা বলতে পারে সে।
"আপনি কি জন্মান্ধ?"
"হ্যাঁ!"
"বেচারা! আপনি কত কিছু যে দেখেননাই, আমরা তো কিছুক্ষণ আগে কত কিছু দেইখা আইলাম, না কি কস?
চপল ভাই সম্মতির আশায় আমার দিকে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দেয়। আমি কিছু বলার আগেই বেচারা অন্ধ ব্যক্তিটা কথা বলে ওঠে,
"আমি দেখতে না পারলেও অনুভব করতে পারি। সবকিছু। লাল রঙ, নীল রঙ, প্রজাপতির ডানা, সূর্যমুখীর হাসি, জোছনা সব!"
এবার আমি লুফে নেই কথাটা,
"আরে বেচারা, খামোখা সান্তনা দিচ্ছেন নিজেকে। আমরা চক্ষুস্মানরা জানি আসল সৌন্দর্য। আর অনুভূতির কথা বলছেন? এক্ষেত্রে অবশ্য আপনাকে সাহায্য করা যায়। আমরা রাতখোর। অনুভূতিখোর। আমরা অনুভূতির সওদা করি। আপনাকেও কিনে দেবো"
"যা আছে সব দিয়া দে! আমগো আরো মাল দরকার"
চপল ভাই এবার ক্ষেপেছে। বেচারা অন্ধটা!
কিন্তু তাকে খুব শান্ত এবং পরিতৃপ্ত দেখায়।
"আমার তো অনেক কিছুই আছে, কত কি নেবে তোমরা? টাকা পয়সা নিচ্ছো নাও। কিন্তু আমার মেয়েটার আদুরে কন্ঠে বাবা ডাক শোনার যে অনুভূতি তা নিতে পারবে?|
"ঐ ব্যাটা চৌপ!"
কিন্তু সে বলেই যায়।
"এই বয়সেও মায়ের কাছে ভাত মাখিয়ে নেয়া, বাবার সাথে লুডু খেলা, স্ত্রীর সাথে..."
"চুপ! চুপ চুপ!" আমিও আর সহ্য করতে না পেরে বলি।
"চল আজ আমার বাড়িতে নিয়ে যাবো তোমাদের। পেট পুরে খাবে, ভালোবাসা আন্তরিকতার কোন অভাব থাকবেনা। আমি নিশ্চিত, তোমাদের সওদা করা অনুভূতির থেকে সেটা অনেক ভালো হবে"
*
আমরা চলতে থাকি তার সাথে। বিশাল এ্যপার্টমেন্ট! বহুতল ভবন। লিফটে করে যেতে হবে। আমরা লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কি যেন বলে উঠলো! আমি ঝট করে তাকালাম চপল ভাইয়ের দিকে।
পিনিক!
যা ভেবেছিলাম তাই। ভীষণ উশখুশ করছে। হিংস্র দেখাচ্ছে তাকে। বেচারা অন্ধ লোকটি এতক্ষণে লিফটে উঠে গেছে। পৌঁছেও গেছে হয়তো ওপরে।
"হালায়, কি ডজটাই না দিলো! তখুন টেকা পয়সাগুলা লয়া লৈলে এতক্ষণে আরেকটা ডোজ নেয়া যাইতো। কি কস? যাই হুম্বুন্দির পুতরে সাইজ কৈরা আহি"
লিফটটা এতক্ষণে নীচে নেমে এসেছে। চপল ভাই তড়িঘড়ি করে উঠে ওপরে যাওয়ার বোতাম টিপে দেয়।
কিন্তু কি অদ্ভুৎ! আমি স্পষ্ট দেখতে বা বুঝতে বা অনুভব করতে পারি চপল ভাইকে লিফটটা নীচে নিয়ে যাচ্ছে। অনেক নীচে! অতল গহীনে। আমি তার আর্তচিৎকারও শুনতে পাই।
*
বোকার মত লিফটটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। ওপর-নীচ সংক্রান্ত জটিলতা আমাকে ভীষণ পর্যুদস্ত করে দিয়েছে। আমি ভাবতে থাকি কোথায় যাবো, কোন পথে...
নেপথ্যে কে যেন বলে ওঠে,
বেচারা!

Comments

Popular posts from this blog

প্যাথেটিক হোমিওপ্যাথি, কেন বিশ্বাস রাখছেন!

তোমার জন্যে শুভ্র গোলাপ, বেড়ালতমা -হামিম কামাল

ডার্ক ওয়েব, ডিপ ওয়েব, মারিয়ানাস ওয়েব, মিথ বনাম বাস্তবতা