অলংকৃত অন্ধকারে

"আমার দিকে তাকিওনা"
নিস্তব্ধতার হিরন্ময় সূত্রকে শব্দ এবং ধ্বনির শৈল্পিক রূপায়ন দিতে জানে সে। যেন আলতো স্পর্শে কাঁচের জলপাত্র ভেঙে দিল আর ভাঙা টুকরোগুলো বাজতে শুরু করল রিনিঝিনি মাদকতায়...
"তুমি না বাজালে কে বাজে
বীণাতন্ত্রিতে লাগে অজস্র কাঁপন
সুবাতাস ঘিরে আছে বলে
কাঁপুনিতে জাগে মূর্ছনা
জাগে সুরসপ্তক "
সেই অপার্থিব শব্দের সম্মোহনী সুরে দল বেঁধে আসে নিস্তব্ধতার পরবর্তী অধ্যায়, এনজাইম, এড্রোনালিন আর পিটুইটারি গ্রন্থির তরল বিস্ময়, প্রাচীন গ্রন্থের ছেড়া পাতা। জেগে ওঠে উদ্ধত সে, ভার্টিগো রোগে যার মৃত্যু, আদিমতম অনুভূতি ধারণ করা স্মৃতিরা তাকে উপযাচক হয়ে জাগিয়ে তোলে। ঘুমবনের প্রাণীকূল- ঘুমবন স্বাপদসঙ্কূল। চুম্বনের ঘ্রাণ খোঁজে, নাক ডুবিয়ে দেয় আগ্নেয় সুরঙ্গপথে।
পরিতৃপ্ত হয়ে সে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বোঁজে। তার চোখে তাকিয়ে আমি দেখতে পাই...
"তোমাকে বলেছিলামনা আমার দিকে তাকাবেনা!"
রাগ -
"আমার নাম বর্ষা। আমার বয়স তখন ছিল ষোল। আমি আইসক্রিম খেতে ভালোবাসতাম। একদিন আমি ধানমন্ডি ৫ এর সামনে ডলসি ভিত্তা'তে আমার প্রিয় ফ্লেভারের আইসক্রিম খাচ্ছিলাম, তখন তারা এলো"
মনে পড়েছে সেদিনের কথা। আমরা ছিলাম পাঁচজন। আর ছিলো সেই মেয়েটা। পরবর্তীতে তার নাম জানি আমি-বর্ষা।
"জোস্ মেয়ে!"
আমার সহপাঠী উত্তেজনা আর আক্ষেপ মেশানো কন্ঠে বলল। আমরা আইসক্রিমের অর্ডার দিয়ে তার ভাইটাল স্ট্যাটিসটিক্স কত হতে পারে তা নিয়ে বাজী ধরি। আমাদের সূচালো চোখের ধারালো ফলা দিয়ে তাকে ক্ষতবিক্ষত করতে থাকি। ব্যাপারটা তার মোটেও পছন্দ হয়না। কিন্তু সেদিন ওখান থেকে বের হবার অবস্থা ছিলোনা। কারণ বাইরে ছিলো প্রবল বৃষ্টি। আর কে না জানে, ভেজা বস্তু বিদ্যুতের সুপরিবাহক! সুতরাঙ আমরা তার ভাইটাল স্ট্যাট সম্পর্কিত আলোচনা প্রলম্বিত করি, এবং তা শেষ হলে তার কুমারীত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করি। আমরা কথা বলছিলাম আর দেখছিলাম। তবে সেদিন আমরা কেউ তার চোখের দিকে তাকানোর সাহস পাইনি। সে রাগে ফুঁসছিলো।
অথচ আজকে! এই অলঙ্কৃত অন্ধকারে, এই নিস্তব্ধ ইরোটিক শুন্যতায়, কোথায় উবে গিয়েছিলো তার রাগ! ফোঁসফোঁসানির বদলে আমি শুনেছিলাম শিহরণ ধ্বনি। আমি আবার তার দিকে তাকিয়ে হাসি,
এবার সে লাজুক, আদুরে গলায় বলে,
"প্লিজ না, এভাবে তাকিওনা প্লিইইইজ!"
আমি তবুও তার দিকে তাকাই...
ভালোবাসার চোখে চোখ
-মুনা!
-হু বল
-তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?
-তুমি বোঝোনা? খামোখাই জিজ্ঞেস কর!
-নাহ, তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসোনা।
-আচ্ছা যাও বাসিনা। একদমই বাসিনা।
আমরা রিক্সায় করে যাচ্ছিলাম। মুনা, আমার প্রথম প্রেম। প্রথম স্পর্শ। কোমলতার জ্যামিতি। তার মনে ছিলো সরলরেখা আর শরীর জুড়ে বৃত্ত আর উপবৃত্তের সমাহার। আমি ছিলাম স্পর্শক হয়ে।
রিকশাটা হঠাৎ করে একটা স্পিড ব্রেকার অতিক্রম করার সময় আমার মাথা ঠুকে যায় হুডের সাথে। আমি ব্যথা পাবার ভান করি।
-"উহ!"
-ঠিক হয়েছে, খুব খুশী হয়েছি।
মুনা কপট আনন্দের ভান করে।
-তাই, কতটা খুশী হয়েছো?
-অনেক!
-১০০ তে কত?
-২০
সে মৃদুকন্ঠে বলে।
-না ১০
সে সংশোধন করে।
-না, ০!
সে এবার আমার দিকে তাকায়। তার বড় বড় চোখে সারল্য আর নিস্পাপতার অভিধান।
আমি আর কারো চোখে এভাবে তাকাইনি কখনও।
"তোমার চোখে দেখেছি আমার সাধের সর্বনাশ
স্বপ্নে স্বপ্নে তোমাতেই আমি করে যাব বসবাস
সাধের সর্বনাশ"
এখনও তার চোখেই তাকিয়ে আছি। এই অন্ধকারেও তাকে চিনে নিতে ভুল হয়না আমার। তার শরীর এবং মনের যেকোনরকম সম্পাদ্য আমি আঁকতে পারি যেকোনসময়। দশবছর ধরে এঁকেই চলেছি। কিন্তু আজ এই অলঙ্কৃত অন্ধকারে তাকে কেমন উন্মনা লাগে। তার চোখে তাকাতে ভয় করে। যদি অন্য কাউকে দেখি! আমার আশঙ্কা সত্যি প্রমাণিত করে সে হিস্টিরিয়াগ্রস্থের মত হাসতে থাকে।
"তখন ভালো করে বলেছিলাম, শোনোনি! এখন দেখ..."
ভয়ের রোজনামচা
- "হেল্লোওওও কিউট বয়! কেমন আছো?"
-"আমি এখন স্কুলে যাচ্ছি আন্টি।"
-"একটু দাঁড়াও, স্কুল তো আর পালিয়ে যাচ্ছেনা"
-"না, ম্যাডাম বকবে"
সে খপ করে আমার হাত চেপে ধরল।
"একদিন স্কুলে না গেলে কিছু হবেনা"
তখন আমি ক্লাশ থ্রি তে পড়ি। আমার তৃতীয় শ্রেণীর অবুঝ আতঙ্ক তার নিঃসঙ্গ অনুর্বর কামনাজর্জর জীবনে, তার মেনোপজকালিন শুস্ক সময়ে ইনিশিয়াল ফ্লুইডের কাজ করত।
শিশির আন্টি।
এরপর ক্লাশ ফোর।
ক্লাশ ফাইভ।
ক্লাশ সিক্স।
ক্লাশ এইট।
এসময়টায় আমি জঙ্গলে থাকার নিয়মকানুন সম্পর্কে অবহিত হতে থাকি, এবং নিজের পশুস্বত্তার অস্তিত্ব অনুভব করে যত্নের সাথে তাকে লালন পালন করতে থাকি।
কিন্তু তার চোখের দিকে তাকাতে আমার ভয় করত।
"কারো চোখে হাহাকার
কারো চোখে রঙ বাহার
কারো চোখে মরনের লোবান
কারো চোখে শুধুই বিলাস
হাতছানি দেয় সর্বনাশ
কারো চোখে কেবল অন্ধকার!"
কিন্তু আজকের এই অলঙ্কৃত অন্ধকারে আমার ভয়, আতঙ্ক, অস্বস্তি, নীতি, শুচিবায়ূতা, বিশ্বস্ততা সম্পর্কিত যাবতীয় মূল্যবোধ পাল্টে যেতে থাকে।
আমি মুনাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে শিশির আন্টিকে জড়িয়ে ধরি। তার চোখের দিকে তাকাতে আমার ভয় করেনা মোটেও। হঠাৎ সে অনুনয় করে ওঠে
"তাকিওনা, প্লিজ!"
গোপন
"সে আমার দিকে তাকায়নি কখনও। তাকাবে কেন? আমি তো কুৎসিত, মোটা, বেঁটে, কালো।"
আমরা তাকে ডাকতাম রঙ চা! নামের রহস্যটা অজানাই থাকুক না হয়!
"তারা কেউই আমার দিকে কখনও তাকায়নাই। সুন্দর সুন্দর সব ছেলেপিলে। সুন্দরী মাইয়াগো পিছে ঘুরতো। আর আমি ধ্বজভঙ্গ সোয়ামির চড়ুইস্নান শেষে ঘিন্নার অনুভূতি নিয়া বৈসা থাকতাম। তাগো এত ইশারা করতাম কেউ দেখতোইনা"
ঐ কাইলা মাগীটারে দেখলেই আমার বমি আসতো।
"আমার বয়স চৌদ্দ। আমার শরীরে গতবছর কোন নদী ছিলনা। কিন্তু এইবছর আমি নদী আর জঙ্গলের অস্তিত্ব টের পাই। খরস্রোতা নদী। মোহনার খোঁজে বয়ে চলে, বয়ে চলে।"
"তক্কেত খাবা আপু? এই নাও তক্কেত"
"কিন্তু তারা কেউ বুঝতোনা আমাকে দেখে। আমার শীর্ণ শরীরের ভেতরের চিড়িয়াখানায় একটা সাপ আর একটা দানবীর উল্লম্ফন দেখতোনা কেউ। কিন্তু আমি সবাইকে গোগ্রাসে গিলতাম। অবশ্য ভাইয়ারা না বুঝে ভালোই হয়েছে। বুঝতে পারলে বড়ই লজ্জার ব্যাপার হত"
আজকের এই অলঙ্কৃত অন্ধকারের রাতে আমি এরকম অজানা অজস্র চোখের দিকে তাকাই। অসম্ভব সব অনুভূতি ডানা মেলে। আমি এবং তার এবং তোমার, হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছ, 'তোমার' অজানা অবদমিত আকাঙ্খা, যা নিয়ে হয়তো আমরা বেঁচে থাকি না জেনেই, কেউ আসেনা সুইচ অন করতে, একসময় আমরা মারা যাই, আমরা পোকামাকড় হয়ে যাই, বৃক্ষ হয়ে যাই, আজকে মনের গহন থেকে অনুভূতির স্লাইস কেটে নিয়ে এসে সেটাকে মাইক্রোস্কোপের নীচে রেখে তার বিবর্ধিত রঙচঙা রূপ দেখি। এ্যাম্পলিফায়ার দিয়ে শিৎকারের ভলিউম বাড়িয়ে দেই, প্রতিবেশীরা কেউ অভিযোগ করেনা, তারা বরঙ টিকিট কেটে বসে পরে লাইভ পর্নো দেখতে, আমাকে, তোমাকে, এবং তাদেরকে এবং আমাকে এবং তোমাকে, হ্যাঁ তোমাকেই!
------------------------------------------------------------------------------
-মুনা
-হু
-তুমি আমাকে ভালোবাসোনা কেন?
-কারণ তুমি একটা জানোয়ার। তুমি আমাকে ভালোবাসোনা কেন?
-কারণ তুমিও একটা জানোয়ার।
-কিভাবে জানলা তুমি!
-সবার মনেই একটা গোপন জানালা থাকে। সেটা কখনও কখনও খুলে যায়। কারুরটা সারাজীবনেও খোলেনা।
-মিথ্যা কথা! এরকম কিছু নাই। তুমি আমাকে সরল পেয়ে যা তা বোঝাচ্ছ!
-আমি তোমাকে ভালোবাসি মুনা। তোমার জানালা তোমার কাছেই থাকুক। আমি তাকাবোনা কখনও সেখানে।
-লক্ষী সোনা! আমিও আর তাকাবোনা।
-ইজ ইট আ ডিল?
-ডিল!
অতঃপর আমরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে যাবতীয় শর্তাবলী লিখে সাক্ষর করি।

Comments

Popular posts from this blog

প্যাথেটিক হোমিওপ্যাথি, কেন বিশ্বাস রাখছেন!

তোমার জন্যে শুভ্র গোলাপ, বেড়ালতমা -হামিম কামাল

How to Integrate External API in a WordPress Page: 5 Ways To Do It